২৮শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

তন্দ্রার বেলা অবেলা’ পর্ব-৩

ধারাবাহিক পর্ব-০৩

আরিফের কিন্তু আর সহ্য হচ্ছে না একবিন্দু পরিমাণ মুহূর্তটুকু। কি এত কথা থাকতে পারে বান্ধবীর সাথে! নাকি ওকে দেখে আজ এদিকে আসছে না। আরিফ কিছু ভেবে পায় না।

জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন আজ আরিফ পালন করছে। আড়ম্বরপূর্ণ না হোক, কিন্তু সামান্য নয়। কানিজকে নানান ভাবে দেখেছে এতদিন। বিগত দিনগুলোতে যেভাবে ও আবির্ভাব হয়েছিল আরিফ এর মনে, আজকের ইম্প্রেশন তার চাইতে অনেক বেশি।

যাক, এবার তাহলে কানিজ এদিকে আসছে। আরিফ ওর পায়ের দিকে তাকালো। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ – আরিফ এর কানে যেন আরো তীব্র আকার ধারণ করলো। সৈয়দ শামসুল হকের নাটকের মতো কী? আরিফ আজ এত কি ভাবছে মনে মনে। কানিজ কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার আসনে ঠিকই বসেছিল, তা না হলে কি আর এ অমূল্য হাসির সন্ধান পাওয়া যেত? মেয়েটা জেদি সাংঘাতিক রকমের। চান্স পেয়েও যেমনটা জেদ পূর্ণ করেছিল। আজকের দিনেও বোধহয় আরেকটা জেদের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় কিনা, কে জানে?

কানিজ আরিফের প্রায় মুখোমুখি। আরিফের এবার ঘাম দিয়ে জ্বর ছোটার পালা। আশেপাশের পরিবেশটা খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে নিল। কার এত দায় পড়েছে নিজের কাজ ফেলে রেখে আরিফকে দেখার। তারপরো তো মনের বাঘের একটা কথা আছে না। জোরেশোরে শ্বাস-প্রশ্বাস ঝেরে সাহস বাড়িয়ে নিল দ্বিগুণ পরিমাণে। আরিফ এর কবিবন্ধুর শেখানো কৌশল এটা। আরিফ ভাবলো সালাম দিয়ে শুরু করি।

কানিজ আরিফের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল নাদেখার মতো করে। কিন্তু ভদ্রতাবশত সালামের জবাবটা ওকে দিতে হলো। আরিফ কিছুটা স্মিতহাস্য বদনে বলল, ” কেমন আছো, কানিজ?
কানিজ স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর করলো, ভালো।
” তোমাকে কিছু বলার আছে আমার। ”
” বলুন, কি বলবেন। আমার হাতে খুব একটা সময় অবশ্য নেই, টুইশনিতে যেতে হবে।”
“আমি খুব একটা সময় নেব না, ক্যাম্পাস এর ভেতরে অবশ্য কথা বললে ভালো হতো।”
“কি এমন কথা?”
” আচ্ছা, তাহলে কাল বলি।” কানিজ এবার খুব বিব্রত বোধ করলো। এই ছেলেগুলো সব বাঁদরের হাড্ডি। মেয়েদের অগোচরে কত কিছু বলে বেড়ায়, অথচ সামনে এলে মুখের কপাট বন্ধ। কানিজ যখন নবম কিংবা দশমে ছিল, সদ্যোজাত গোফের রেখাওয়ালা ছেলেগুলোর ঠোঁটের কম্পনময় অনেক ধ্বনি তখন ও শুনেছে। কলেজেও তিনটা প্রস্তাব পেয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন অবশ্য একেবারে অন্যরকম। এখানে প্রেম-ভালোবাসা অবশ্য স্বার্থ ও প্রয়োজনকেন্দ্রিক। সবক্ষেত্রে অবশ্য এক না। আবেগটাকে অনেকেই বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু সে বেচারারা বেশিরভাগই মনে মনে প্রেম পোষে। এসব বিষয়ে কানিজও তেমন একটা মাথা ঘামায় না। আরিফ মনে হয় এমন কিছু একটা বলবে।

কানিজ এর মন যদি আরিফ পড়তে পারতো, আরিফ বোধহয় আরেকটু বুঝে কাজ করতে পারতো। গত একবছর যাবত যে মনটা উড়ে গেল অন্য কোন মনে, সে মনের লাগামটা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে সে। জীবন যত বেশি যাপিত হয়, আশা-আকাঙ্ক্ষার বহর তার বাড়তেই থাকে।

আরিফ অবশেষে বলল। মনের গহীন কোণে লুকিয়ে রাখা ভাষাগুলোকে দিল ধ্বনির মর্যাদা। সে ধ্বনি কি আরেকজনের কানে মধুর সুরে বাজবে, নাকি সেটা হবে শবদূষণ? আরিফ কিছু ভেবে উঠতে পারে না।

কানিজ এর কোন ভাবান্তর চোখে পড়ল না। ওর মুখ থেকে শুধু একটা কথাই উচ্চারিত হলো, ” আমি যাই, সময় চলে যাচ্ছে। ”
চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল কানিজ। আরিফ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকলো, যতদূর কানিজকে দেখতে পাওয়া যায়। আরিফ হয়তো মনে মনে এর আগেও দু’একজনকে পছন্দ করেছিল, অথচ মনোপ্রাণ ঢেলে দিয়ে আজকেই প্রথম কানিজকে বলল সে কথা।
কাল রাতে একফুটো ঘুম আসে নি আরিফের চোখে। আজকে বলে নিস্তার পেয়েছে ঠিকই কিন্তু আজকে কি ও ওর মনের কথা বলে খালাস পেল, নাকি নতুন করে আরো জ্বালা বরণ করে নিলো? আরিফ চায়ের দোকানে এসে বসলো। কেন যেন একবার মনে হলো, না বললেই বুঝি ভালো হতো। কবির কথা স্মরণ হলো একবার। আজকের এ বলাটা মূলত তার অনুরোধে। প্রেমিকাকে মনের কথা না খুলে বললে নাকি প্রেম পূর্ণতা পায় না। এটা তার বাণী। কিন্তু যে অপেক্ষার প্রহর এতোদিন যাবত চলছিল আজ কি তার অবসান হলো, নাকি নতুন করে শুরু হলো আজ?….(চলবে)

লেখক: চন্দ্রনাথ ধর
ডিপার্টমেন্ট অফ ফাইন আর্টস জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

( গল্পটির ধারাবাহিক পর্বগুলো পেতে চোখ রাখুন ‘দৈনিক জনপত্র’ )

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print
ফেসবুক