২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বরিশালে এক বস্তিতে শিশুদের তৈরি ৩০টি শহীদ মিনার

অনলাইন ডেস্ক: বরিশাল শহর ঘেঁষা কীর্তনখোলা নদীর বাঁকে জেগে ওঠা চরের নাম রসুলপুর কলোনি (বস্তি)। এই বস্তিটি সিটি কর্পোরেশনের ৯নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত। আট বছর পূর্বে এই বস্তিতে শহীদ মিনার বলতে কিছু ছিল না। কিন্তু সময়ের এগিয়ে চলায় সেখানকার শিশুরা এখন জানে শহীন মিনার কি, কিভাবে বাংলা ভাষার জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে।

তাই এই বস্তিতেই শিশুদের পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে এক একটি শহীদ মিনার। এখন সেখানে শহীদ মিনার নির্মাণে যথারীতি প্রতিযোগিতা হচ্ছে। কুসংস্কারের আচ্ছাদন খুলে ফেলতে এই আয়োজন। এ বছর রসুলপুর কলোনিতে ৩০টি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। দল ভিত্তিক কাজ করে এই নির্মাণযজ্ঞে অংশ নিয়েছেন কমপক্ষে ১৫০ শিশু।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ইতিহাস বদলে ফেলে কলোনির অলি-গলিতে, ঘিঞ্জি পরিবেশের মাঝে সামর্থ্য অনুযায়ী গড়ে তোলা হয়েছে শহীদ মিনার। মাটির বেদীতে কাঠ, ইট দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে প্রতিটি মিনার। কাঠের গুড়োর সাথে রঙ মিশিয়ে লেখা হয়েছে ভাষা শহীদদের নাম। অঙ্কিত হয়েছে মানচিত্র। রঙিন কাগজে আবৃত করা হয়েছে শহীদ মিনার এলাকা। এক ভিন্ন পরিবেশ ফুটে উঠেছে শিশুদের কোমল হাতের ছোঁয়ায়।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান সঞ্জয় সরকার বলেন, শহীদ মিনার আমাদের জাতিসত্তার প্রতীক। আগে শুনেছি শহীদ মিনার নির্মাণের প্রতিযোগিতার কথা। কিন্তু আজ দেখতে এসে সত্যিই আমি অভিভূত। এত সুন্দরভাবে শিশুরা প্রতিটি শহীদ মিনার তৈরি করেছেন দেখে আমি আপ্লূত।

তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র আরিফুল রাতভর চেষ্টা করে নির্মাণ করেছে শহীদ মিনার। চোখে এখনো ঘুমভাব। তারপরও আপন হাতে গড়ে তোলা মিনারটির সৌন্দর্যে কাজ করে যাচ্ছেন। সে জানায়, প্রতি বছরই শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। কাজটি করতে তার ভালো লাগে।

আরিফ জানায়, টিমের সবাই মিলে মা-বাবার কাছ থেকে ১৬০ টাকা নিয়ে সম্পন্ন করেছে পুরো নির্মাণ কাজ।

চকবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে বেল্লাল সরদারের মেয়ে মিম। ওরাও তিন ভাইবোন মিলে ঘরের সামনেই তৈরি করেছে একটি শহীদ মিনার। চারপাশের যে হেটে যাচ্ছেন তাদের সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাচ্ছেন ওদের নির্মিত শহীদ মিনারটি।

মিমদের একঘর পরে মমিনুল ইসলাম সিয়ামের নির্মিত শহীদ মিনার। সে শুধু শহীদ মিনার নির্মাণ করে শেষ করেনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তে রঞ্জিত দিনটির ইতিহাস ছোটভাই বায়জিদকে সঙ্গে নিয়ে অভিনয় করে দেখিয়ে দেয়। সকালে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শুরু করেছেন অভিনয়।

কতবার মানুষকে এই অভিনয় করে দেখিয়েছেন তা গুনে ভলতে না পরলেও সিয়াম বলেন, আমার ভালো লাগে ২১ ফেব্রুয়ারির অভিনয় করতে। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী স্মৃতি নির্মাণ করেছেন অমর একুশের স্মৃতির মিনার। তার নির্মিত শহীদ মিনার দেখতে যাওয়া সবাইকে জানিয়ে দেন সে যা জানে ভাষা সংগ্রাম নিয়ে। এভাবে একে একে ৩০টি শহীদ মিনারের নির্মাণ শিল্পীরা স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতায়।

শিশুদের মধ্যে ভাষা দিবসের এই চেতনা জাগ্রত করেছিলেন বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। তিনি জানান, প্রতিযোগিতার শুরুর গল্পটা। ২০১৪ সালে রসুলপুরের সরকারি জমিতে ‘বস্তি উচ্ছেদ’ অভিযানের খেটে খাওয়া নিম্নবিত্তকে সহমর্মিতা জানাতে এসে ও উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের দাবি জানাতে এসে একটি বিষয় নজরকাড়ে। রসুলপুর বস্তিতে শিশুদের শহীদ মিনার নির্মাণে বাধা প্রদান করা হচ্ছে। তখন একটিও শহীদ মিনার ছিল না এখানে। এমনকি শিশুরা নির্মাণ করতে গেলে বড়রা ‘মূর্তি’ আখ্যা দিয়ে শিশুদের নিবৃত করতো।

ডা. মনীষা বলেন, শিশুদের যা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছিল তাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় ছিল। তাদের ভুল ইতিহাস শেখানো হচ্ছিল। আমি সংগ্রামটা সেখান থেকে শুরু করি। চিন্তা করি কুসংস্কারটি কিভাবে কাটানো যায়। শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম যে শহীদ মিনার নির্মাণে বাধা দেওয়া হচ্ছে সেখানে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। সেই চিন্তা আমার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে পরামর্শ করলে তারাও এগিয়ে এলেন।

মূলত, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট এত বছর ধরে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতা শুরু করি রসুলপুরে। প্রথমে ৭-৮টি শহীদ মিনার নির্মিত হত। পর্যায়ক্রমে তা বাড়তে লাগলো।

২০১৭-১৮ সালে রসুলপুরে অর্ধশতাধিক শহীদ মিনার নির্মাণ করে শিশুরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় উল্লেখ করে ডা. মনীষা বলেন, বর্তমানে রসুলপুরের উত্তর পাশে একটি সেতু নির্মিত হয়েছে। এ কারণে অনেকেই এখানে দালান তুলতে শুরু করেছেন। সে কারণে সংখ্যায় একটু কমেছে শহীদ মিনার নির্মাণ। তবে সন্তুষ্টির জায়গা হলো, শিশুরা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ১৯৫২ সালের ইতিহাস জানতে পারছে। আমাদের ভাষা সংগ্রামের বীজ বপন হচ্ছে ওদের মনে।

এ বছর শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতার পাশাপাশি অঙ্কন, আবৃত্তি, গান, নৃত্য ও অঙ্ক দৌড়ের প্রতিযোগিতাও চলছে। ব্যবস্থা করা হয়েছে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের। সন্ধ্যায় ছিল শিশুদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মোদ্দা কথা ২১ ফেব্রুয়ারি ঘিরে ভাষা উৎসব চলছে রসুলপুরে।

এই আয়োজনকে সাধুবাদ জানিয়ে বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি নজমুল হোসেন আকাশ বলেন, ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতা নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার আয়োজন। সেই সঙ্গে আমাদের জাতীয়তা, জাতিসত্তার মানস গঠনে কাজ করা অনবদ্য। আমি এই আয়োজনের সফলতা কামনা করি। কারণ, এর মাধ্যমে আসন্ন প্রজন্ম জানতে পারছে, শিখতে পারছে বাংলা ভাষার পথ পরিক্রমা।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print
ফেসবুক