২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

চাকুরী বাঁচাতে রাজধানীমুখি দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা

  • বিজিএমইএ বলছে, কাজে না আসলেও চাকরি থাকবে
  • শ্রমিকরা বলছেন, না গেলে চাকরি থাকবে না

শফিক মুন্সি ও মোঃ জিয়াউদ্দিন বাবু ॥
গতকাল শনিবার সকাল থেকে বজ্রসহ বৃষ্টি বরিশালে। এরমধ্যেই ঢাকার গার্মেন্টস সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী শ্রমিকদের ভীড় বাড়ে নগরীর রূপাতলী ও নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালে। আজ (১ আগস্ট) থেকে এসব প্রতিষ্ঠান খুলে দেবার সিদ্ধান্তে ঢাকার দিকে রওনা দিয়েছেন এসব মানুষ। তবে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বিপাকে পরতে হয়েছে তাদের। বিভিন্ন বিকল্প পদ্ধতিতে ঢাকা যেতে গুনতে হয়েছে বাড়তি ভাড়া। তবে বিকেলে ঈদে গ্রামে যাওয়া শ্রমিকদের এখনই কর্মস্থলে ফিরে না আসার জন্য অনুরোধ জানায় পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, কারখানার মালিকপক্ষ প্রত্যেক শ্রমিককেই কর্মস্থলে যোগ দিতে ফোন করেছে ও গোপনে মোবাইলে মেসেজ পাঠাচ্ছে। ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়া এক গার্মেন্টস কমী জনপত্রকে জানান, তাদের কারখানা থেকে সুপারভাইজার অফিসে আসার জন্য বলেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজে যোগদান না করলে চাকরি থাকবে না বলে অভিযোগ করেছে একাধিক গার্মেন্টসকর্মী।

গতকাল সকাল থেকে বরিশালের পার্শ্ববর্তী জেলা-উপজেলা থেকে আসা শুরু করে মানুষজন। এদিকে উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে বজ্রসহ বৃষ্টি জারি রয়েছে গত তিনদিন ধরে।চলমান লকডাউনে বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় পায়ে হেঁটে, অটো-মাহিন্দ্রা-মোটরসাইকেল ভাড়া করে এবং পণ্যবাহী ট্রাকে চেপে রাজধানী ঢাকার পথে যাত্রা চেষ্টা করেন তারা। এদিকে বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে নথুল্লাবাদ এলাকার বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে চলাচলরত পণ্যবাহী ট্রাকের পথরোধও করেন ঢাকাগামী মানুষেরা। এতে বেশ কিছুক্ষণ যান চলাচল থমকে যায়।

খবর পেয়ে নগরীর বিমানবন্দর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই পণ্যবাহী ট্রাকের চলাচল স্বাভাবিক করে।বর্তমানে সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বিপ্লব বড়ুয়া। ঢাকা মুখি এসব মানুষেরা নগরীর দুটি টার্মিনালে এসে জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে কাজে যোগ দিতে কর্মস্থলে পৌঁছাতে দিশেহারা তারা। খারাপ আবহাওয়া কিংবা লকডাউন তাদের ভোগান্তিই বাড়িয়েছে উর্ধগতিতে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তবুও এসব মানুষ যে যেভাবে পারছে ছুটছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। এতসব ঝক্কি আরো দ্বিগুণ হয়েছে সড়কে চলার সুযোগ পাওয়া যানবাহনের চালকদের কল্যাণে। প্রতিটি স্থানে বিপদগ্রস্ত এসব মানুষদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে অতিরিক্ত ভাড়া। এদিতে গতকাল মহিউদ্দিন নামের এক যুবক ভোলা থেকে এসেছেন রাজধানীর উদ্দেশ্যে। পটুয়াখালী থেকে এসেছেন রেহানা নামের আরেক যাত্রী।

দুই জনেই ঢাকার গার্মেসে চাকুরী করে। তাদের সাথে কথা হলো নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালে। তারা জানান, চাকুরী বাচাতে হলে যে কোন উপায় যেতে হবে ঢাকায়। পটুয়াখালী থেকে হেটে আসা রফিক জানান লকডাউন না তুলে কলকারখানা খোলার সিদ্ধান্ত মোটেই যৌক্তিক না। চাকুরী বাচাতে হলে যে ভাবেই হোক ঢাকা যেতে হবে। চাকরি বাঁচাতে এসব মানুষদের ঢাকা যেতে বাধ্য হয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে আর্থিক ক্ষতি। তবে বিজিএমইএ বিকেলে জানায়, লকডাউন প্রত্যাহারের আগে কোনো শ্রমিক কাজে যোগদান করতে না পারলেও তাদের চাকরি যাবে না।

সরকার লকডাউন প্রত্যাহার কিংবা শিথিল করলে শ্রমিকরা যথারীতি কাজে যোগদান করবে। এতে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। ঢাকার সাভারে যেতে বাকেরগঞ্জ থেকে বরিশালের নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালে আসে শাকিল আহমেদ। বেলা ১ টার দিকে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, সকাল ৮ টায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুটা পথ পায়ে চেপে কিছুটা পথ মোটরসাইকেল ভাড়া করে বরিশাল পৌঁছেছেন তিনি।অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কিছু না পেয়ে মাদারীপুরগামী একটি ট্রাকে আরো কয়েকজনের সঙ্গে চেপে বসেন রূপাতলী থেকে।কিন্তু নথুল্লাবাদ পুলিশ চেকপোস্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাঁধায় আটকে যান তারা। তিনি ক্ষোভের সুরে বলেন, যদি মোগো যাইতেই না দেবে তয় কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত নেছে ক্যা? বরিশাল তামাইত আইতেই জান যাইতে বইছে।

এহন ঢাকা তামাইত কেমনে যামু হেই চিন্তায় আছি। চাকরি না থাকলে সরকারতো বাড়িত ভাত দিয়া আইবে না। কারখানা খোলার লগে লগে আমাগো লইগ্গা বাস-লঞ্চও খোলা উচিত আছেলে। রূপাতলী বাস টার্মিনালে ঢাকার একটি বেসরকারি শিল্প কারখানার কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছিলাম পরিবার নিয়ে। লকডাউনে প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে না এমন নির্দেশনায় বাড়িতে আসার সিদ্ধান্ত নেই।এখন লকডাউনের মধ্যেই ফিরতে হচ্ছে। একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করেছি সাড়ে ৮ হাজার টাকায়। দেখি পুলিশ কতদূর যেতে দেয়।

বরগুনা থেকে তিনবার ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল বদলে বরিশালে আসেন আজমল হোসেন। তিনি বলেন, শুক্রবার রাতে আমাকে অফিস থেকে জানানো হয় রোববার থেকে কাজে যোগদান করতে হবে। তিনটি মোটরসাইকেলে ভাড়া দিতে হয়েছে প্রায় ৬০০ টাকা। যেখানে বাস চলাচল করলে ১৫০ টাকায় বরিশালে আসতে পারতাম। এখন ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে কত খরচ হয় সেটা নিয়েই চিন্তায় আছি।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print
ফেসবুক