১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আপনাদের সঙ্গে আছি, ই-অরেঞ্জের গ্রাহকদের মাশরাফি

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে বেশ কয়েক দিন ধরেই আলোচনায় জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডর হিসেবে কয়েকটি বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। এখন অনেকেই প্রতিষ্ঠানটির কাছে পণ্য না পেয়ে দায়ী করছেন মাশরাফিকে। কয়েকবার তার বাড়ির সামনেও ভিড় করেছেন ই-অরেঞ্জের গ্রাহকরা।

সোমবারও তার বাড়ির সামনে কয়েকজন নারী গ্রাহক ভিড় করেন। তারা তাদের পাওনা অর্থ আদায়ে মাশরাফির সহযোগিতা চান। এ সময় জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ‘শেষ নিঃশ্বাস অবধি তাদের সঙ্গে আছেন’ বলে জানান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মাশরাফি নিজেই।

সোমবার রাতে মোবাইল ফোনে মাশরাফি বলেন, ‘আজ যে নারীরা (ভুক্তভোগী) এসেছিলেন তাদের একটা কথাই বলেছি, আমার শেষ নিঃশ্বাস অবধি আপনাদের সঙ্গে আছি। আপনারা যতটুকু করতে বলবেন, আছি। কিন্তু আমারও সীমাবদ্ধতা আছে। আমি এটুকুই বলেছি। কেউ ভিন্ন কিছু বললে বানিয়ে বলেছে।’

আজ যে নারীরা (ভুক্তভোগী) এসেছিলেন তাদের একটা কথাই বলেছি, আমার শেষ নিঃশ্বাস অবধি আপনাদের সঙ্গে আছি। আপনারা যতটুকু করতে বলবেন, আছি। কিন্তু আমারও সীমাবদ্ধতা আছে। আমি এটুকুই বলেছি। কেউ ভিন্ন কিছু বললে বানিয়ে বলেছে
মাশরাফি বিন মুর্তজা
ই-অরেঞ্জের প্রতারণার সব দায় নিজের ওপর আসায় ক্ষোভ ঝেড়েছেন এ সংসদ সদস্য। বলেন, ‘আমার আসলে দায় কেন? আমি কি মালিক? যারাই আসছেন তাদের তো বলতে পারতাম যে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেন। সেটাও তো আমি বলিনি কাউকে। বলেছি, আমি আমার মতো চেষ্টা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি একজন ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডর। আমার কাছে এসব বলে লাভ কী? আমি যদি তাদের শেয়ার হোল্ডার হতাম বা এমন কিছু… তাহলে একটা কথা ছিল। আইনের বাইরে গিয়ে মাশরাফি কী করবে? তারা জেলে আছে, তাদের তদন্ত হচ্ছে। সেটা তো এখন পুলিশের বিষয়।’

ইভ্যালির উদাহরণ টেনে মাশরাফি বলেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের স্পন্সর ইভ্যালি, কেউ কি তাদের কাছে গিয়েছে? আমার কাছে সুবিচার চাইবে, আমি তো মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কেউ না। আমি তো বাড়ি গিয়ে বলে আসিনি এটা করেন। আমি আওয়ামী লীগ করছি, আপনি করবেন? আপনি তো যেটা পছন্দ সেটাই করবেন। পৃথিবীর কোথাও আইনে যদি থাকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডর দায়ভার নেবে, তাহলে আমিও নিতে রাজি আছি।’

আমি একজন ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডর। আমার কাছে এসব বলে লাভ কী? আমি যদি তাদের শেয়ার হোল্ডার হতাম বা এমন কিছু… তাহলে একটা কথা ছিল। আইনের বাইরে গিয়ে মাশরাফি কী করবে? তারা জেলে আছে, তাদের তদন্ত হচ্ছে। সেটা তো এখন পুলিশের বিষয়
মাশরাফি বিন মুর্তজা
প্রসঙ্গত, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের মালিকপক্ষ প্রতারণামূলকভাবে গ্রাহকদের এক হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে তাহেরুল ইসলাম নামের এক গ্রাহক গুলশান থানায় এমন অভিযোগ জানিয়ে মামলা করেছেন।

মামলায় ই-অরেঞ্জের মূল মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমান, মালিক বীথি আকতার, প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) আমানউল্লাহ চৌধুরী, প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদসহ প্রতিষ্ঠানটির সব মালিককে আসামি করা হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়, গত ২৮ এপ্রিল থেকে নানা সময়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য কেনার জন্য টাকা দেওয়া হয়, যা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের পর সরবরাহ করার কথা ছিল। কিন্তু ই-অরেঞ্জ এক লাখ ভুক্তভোগীর সঙ্গে প্রতারণা করে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা ই-অরেঞ্জের অফিসে গিয়ে পণ্য সরবরাহ চাইলে জানানো হয়, কিছুদিনের মধ্যে পাঠানো হবে। কিন্তু কোনো পণ্য সরবরাহ করা হয়নি।

বাড়ির সামনে উপস্থিত ই-অরেঞ্জ গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলছেন মাশরাফি / ছবি- ১৭ আগস্ট
ই-অরেঞ্জের প্রতারণার টাকা আদায়ে সোমবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মাশরাফি বিন মুর্তজার মিরপুরের বাসায় যান ভুক্তভোগী সাত-আট জন নারী গ্রাহক। তাদের একজন উম্মে হানি। তিনি ই-অরেঞ্জে ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। তিনি বলেন, আজ (সোমবার) আমরা সাত-আটজন (নারী গ্রাহক) মাশরাফি ভাইয়ের বাসায় যাই। সেখানে টাকা আদায়ের বিষয়ে তার সঙ্গে দুই-তিন ঘণ্টা আলোচনা হয়। আলোচনার একপর্যায়ে অনেকে কান্নাকাটি শুরু করে দেন।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের স্পন্সর ইভ্যালি, কেউ কি তাদের কাছে গিয়েছে? আমার কাছে সুবিচার চাইবে, আমি তো মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কেউ না। আমি তো বাড়ি গিয়ে বলে আসিনি এটা করেন। আমি আওয়ামী লীগ করছি, আপনি করবেন? আপনি তো যেটা পছন্দ সেটাই করবেন। পৃথিবীর কোথাও আইনে যদি থাকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডর দায়ভার নেবে, তাহলে আমিও নিতে রাজি আছি
মাশরাফি বিন মুর্তজা
তখন মাশরাফি ভাই আমাদের বলেন, ‘আমি এটার (ই-অরেঞ্জ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়ে) শেষ দেখে ছাড়ব। আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। যদিও বিষয়টা এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আছে, তাই আমার বেশি কিছু করার নেই। তবে আমি আপনাদের সঙ্গে আছি।’

তখনও সবাই শান্ত না হলে মাশরাফি ভাই বলেন, ‘আপনারা এভাবে কান্নাকাটি করলে এবং ভেঙে পড়লে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তখন টাকার সঙ্গে সবই যাবে। এখনও টাকা পাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক কিছু হচ্ছে না। তবে, আপনারা ধৈর্য ধরেন, টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত মনে করেন জানের সদকা হিসেবে এ টাকা দিয়েছেন। আপনাদের টাকা উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আমি আপনাদের সঙ্গে আছি।’ই–অরেঞ্জের ‘পৃষ্ঠপোষক’ সোহেল রানা ভারত-নেপাল সীমান্তে আটক
‘জানের সদকা’ হিসেবে ই-অরেঞ্জে বিনিয়োগ করা টাকার আশা মাশরাফি ছেড়ে দিতে বলেছেন কি না— জানতে চাইলে উম্মে হানি বলেন, ‘না বিষয়টি তিনি এভাবে বলেননি। তিনি এটা বোঝাতে চেয়েছেন যে টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা এটা ধরে নিই। তবে অনেক লোক ছিল সেখানে। কে কীভাবে বিষয়টি নিয়েছেন, আমি তা বলতে পারব না।’

আপনারা এভাবে কান্নাকাটি করলে এবং ভেঙে পড়লে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তখন টাকার সঙ্গে সবই যাবে। এখনও টাকা পাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক কিছু হচ্ছে না। তবে, আপনারা ধৈর্য ধরেন, টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত মনে করেন জানের সদকা হিসেবে এ টাকা দিয়েছেন। আপনাদের টাকা উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আমি আপনাদের সঙ্গে আছি
ভুক্তভোগী উম্মে হানি
উম্মে হানি আক্ষেপ প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আমি আজ সর্বস্বান্ত। এ টাকা ফিরে না পেলে আমার আর বাঁচার উপায় নেই। দেশে কি দুর্নীতিবাজরা এভাবে পার পেয়ে যাবে? আমাদের টাকা কি আমরা ফিরে পাব না?’

ই-অরেঞ্জের অফিশিয়াল নাম ই-অরেঞ্জ ডট শপ। দুই বছর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেয় প্রতিষ্ঠানটি। ট্রেড লাইসেন্সের ফরমে ই-অরেঞ্জের মালিকের নামের অংশে উল্লেখ রয়েছে সোনিয়া মেহজাবিন, পিতা শেখ আবদুস সালাম ও মাতা নাজমা সালাম।

মাশরাফির বাড়ির সামনে উপস্থিত ই-অরেঞ্জ গ্রাহকদের বিক্ষোভ / ছবি- ১৭ আগস্ট
না বিষয়টি তিনি এভাবে বলেননি। তিনি এটা বোঝাতে চেয়েছেন যে, টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা এটা ধরে নিই। তবে অনেক লোক ছিল সেখানে। কে কীভাবে বিষয়টি নিয়েছেন, আমি তা বলতে পারব না
ভুক্তভোগী উম্মে হানি
ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী মাশুকুর রহমানসহ তিনজন এখন কারাগারে। এজাহারভুক্ত বীথি আক্তারসহ দুজন পালিয়ে গেছেন। গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ই-অরেঞ্জের সঙ্গে সম্পৃক্ত বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সোহেল রানাকে ভারত-নেপাল সীমান্ত এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফের) সদস্যরা পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার চ্যাংড়াবান্দা সীমান্ত থেকে অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাকে আটক করে।

ভারতে আটক সোহেল রানাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ পুলিশ।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print
ফেসবুক